• রোববার   ২৬ জুন ২০২২ ||

  • আষাঢ় ১২ ১৪২৯

  • || ২৫ জ্বিলকদ ১৪৪৩

বরিশাল প্রতিবেদন
ব্রেকিং:
পদ্মা সেতুর সফলতায় প্রধানমন্ত্রীকে কুয়েতের রাষ্ট্রদূতের অভিনন্দন নতুন প্রজন্মকে প্রস্তত হতে বললেন প্রধানমন্ত্রী আমরা বিজয়ী জাতি, মাথা উঁচু করে চলবো: প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ: রাষ্ট্রপতি মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে: প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণাঞ্চলের উন্নতির জন্য নিজের জীবন দেয়ার ওয়াদা- প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতুর ওপর হাজারো মানুষের ঢল ‘আছে শুধু ভালোবাসা, দিয়ে গেলাম তাই’ শিবচরের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ: পদ্মা সেতুর শুভ উদ্বোধন কংক্রিটের অবকাঠামো নয়, পদ্মা সেতু আমাদের অহংকার: প্রধানমন্ত্রী এ সেতু স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি: প্রধানমন্ত্রী ৪২টি পিলার বাংলাদেশের আত্মমর্যাদার ভিত: প্রধানমন্ত্রী ‘সর্বনাশা’ থেকে ‘সর্বআশা’ পদ্মা পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু পদ্মার বুক চিরে বাংলাদেশের ‘সাহস’ পদ্মা সেতুর উদ্বোধন দেশের জন্য গৌরবোজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক দিন সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর মতো সব প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন কামনা করছি: রাষ্ট্রপতি দখিনা দুয়ার খুলছে আজ

৫৫ বছর বয়সে ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় বেলায়েত শেখ

বরিশাল প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ২১ মে ২০২২  

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস, সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভর্তি পরীক্ষার প্রবেশপত্র দিয়ে দোয়া চেয়েছেন ৫৫ বছর বয়সী একজন। মুহুর্তের মধ্যে প্রবেশপত্র সহ নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় সেটি। চলতে থাকে নানা গাল-গল্প। বলছিলাম গাজীপুর জেলার শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া পশ্চিমখণ্ড এলাকার মৃত হাসেন আলী শেখ ও জয়গন বিবির চার সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান বেলায়েত শেখের কথা। 
১৯৬৮ সালে জন্ম নেয়া বেলায়েত, ছোট থেকেই পড়াশোনার প্রতি ছিল আগ্রহ। প্রবল আগ্রহ থাকলেও দারিদ্র্যের কারণে কূল পেয়ে উঠেন নি তিনি। এত বিপত্তির মাঝে ১৯৮৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা (এসএসসি) যে না মাত্র বসতে যাবে তখনই অসুস্থ হয়ে পড়েন তাঁর বাবা হাসেন আলী। পরীক্ষার জন্য ফর্ম ফিলআপের পুরো টাকা ব্যায় হয় বাবার চিকিৎসার পেছনে। পরবর্তীতে যে-না পরীক্ষায় বসতে যাবেন আবারও বিধি-বাম, ১৯৮৫ সালে বন্যা এসে আবার তা ভণ্ডুল হয়ে যায়। এদিকে ১৯৯১-৯২ তে গিয়ে মা অসুস্থ হয়ে পড়লে আবারও বাঁধ সাধে। মা ভক্ত বেলায়েত মনে করেন, “দুনিয়াতে মা বেঁচে না থাকলে এই লেখাপড়া দিয়ে কি হবে।” লেগে পড়েন মাতৃসেবায়। কাঁধে নেন পুরোপুরি সংসার।
এসএসসি দিতে না পারায় মেকানিক্যাল কোর্স করে মোটর গাড়ির ওয়ার্কশপ কাজ শুরু করেন তা দিয়েই চলে সংসার। সঙ্গে ভাই-বোনদের পড়াশোনার দায়িত্ব পড়ে তাঁর কাঁধে। অভাবের মাঝে ভাই-বোনদের উচ্চ শিক্ষা দিতে না পেরে সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন বুনেন, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) উচ্চ শিক্ষা নিয়ে। তিন সন্তানের জনক বেলায়েত শেখ। 
বড় ছেলে গাজীপুরের একটি কলেজ থেকে স্নাতকে পড়ছেন, সেই সঙ্গে মাওনা চৌরাস্তায় তাঁকে স্যানেটারির দোকান করে দিয়েছেন বেলায়েত শেখ। সম্প্রতি তাকে বিয়েও করিয়েছেন। একমাত্র মেয়েকে ঘিরে বেলায়েত শেখের ছিল সকল স্বপ্ন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, “আমার মায়ের পরে আমি আমার মেয়েকে অনেক ভালবাসতাম। স্বপ্ন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে হয় তো মেয়েটি আমার মুখ উজ্জ্বল করবে। হবে বিসিএস ক্যাডার।” সেজন্য রাজধানীর নামকরা কলেজে ভর্তিও করিয়েছেন কিন্তু মেয়ে সেখানে পড়াশোনা না করেই গ্রামে চলে আসে। সেখানে এইচএসসি শেষে একটি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হয়।
সকল স্বপ্ন যেন তখনই শেষ হয়ে যায়, বেলায়েত শেখ বলেন। ওই কলেজে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত পড়েছে তার মেয়ে। এরপর তাকেও বিয়ে দিয়ে দেন। এদিকে বেলায়েত শেখের সবচেয়ে ছোট ছেলে এ বছর মাধ্যমিক পাস করেছেন, তিনিও পড়ছেন একটি ইঞ্জিনিয়ারিংএ কলেজে।
 
তিন সন্তানই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) না পড়ার যন্ত্রণা জেঁকে বসে বেলায়েতের। সকল অপ্রাপ্তি অপূর্ণতা সন্তান, ভাই-বোনের কাঁধ থেকে নামিয়ে নিজের কাঁধেই তুলে দেন বেলায়েত। শুরু করেন পড়াশোনা। চলতি বছরে ঢাকা মহানগর কারিগরি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি-ভোকেশনাল) জিপিএ ৪.৪৩ নিয়ে পাস করেন। এর আগে ২০১৯ সালে বাসাবোর দারুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসা থেকে জিপিএ ৪.৫৮ পেয়ে মাধ্যমিক সমমান দাখিল (ভোকেশনাল) পাস করেন।

এ বয়সে সংসার সামলে পড়াশোনার অনুপ্রেরণা কার কাছ থেকে পান জানতে চাইলে বেলায়েত শেখ বলেন, “আমার মা, আমার সকল অনুপ্রেরণার উৎস।” এছাড়া শ্রীপুর কারিগরী কলেজের বন্ধু প্রভাষক মো. সিদ্দিক ও উনার স্ত্রী মারুফা ও অধ্যক্ষ সেলিমের কারণে এতদূর আসতে পেরেছেন বলে জানান তিনি। এত কিছুর মাঝে জীবন যুদ্ধে জয়ী হতে চাওয়া ও স্বপ্নের পানে ছুটে চলা বেলায়েত একটি জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন টিভিতে সাংবাদিকতাও করছেন।

বেলায়েত শেখ আগামী মাসে অংশ নিতে যাচ্ছেন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভর্তি যুদ্ধে। নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো পূরণে দিন-রাত পরিশ্রম করে চলছেন স্বপ্নের পানে ছোটা এ যোদ্ধা। বেলায়েত বলেন, “সন্তানরা আপনার স্বপ্নগুলো গুঁড়ে-বালি করে দিয়েছে। তাই নিজের স্বপ্ন নিজেই পূরণ করার যুদ্ধে নেমেছি।” ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির প্রস্তুতি ঝালিয়ে নিতে ভর্তি হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং এ। ঢাবিতে বয়স নিয়ে কোন জটিলতা থাকলে তিনি আদালতে রীট করতেন বলে জানান। তিনি বলেন “আমি যদি এসএসসি, এইচএসসি পাশ করি চেষ্টা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত অসুবিধা কই? বাকিটা আল্লাহর ভরসা।”

এ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের উদ্দেশ্যে বেলায়েত শেখ বলেন, “আজকের ছেলে মেয়েরা অনলাইনে যে সময় ব্যয় করে, তাঁরা যদি লেখাপড়ার পেছনে এ সময় দেয়। বাবা-মার সেবা যত্ন করে, তাঁরা অনেক সফল হবেন। বাবাকে একটু মাকে একটু খুশি করি, কেন যেন সন্তানরা বোঝে না”, বলে হতাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

পরিবারের লোকজন ও সন্তানরা পড়াশোনা করার বিষয়টি কীভাবে দেখেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এক সময় তাঁরা ভালভাবে নিত না তবে এখন তাঁরা ভাল ভাবে নেয়। তাছাড়া কোচিং যখন তিনি ভর্তি হতে যান তখন অভিভাবকের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। বাবা বেঁচে নেই, মা অসুস্থ। তাই তাঁর বড় ছেলেই অভিভাবক হিসেবে স্বাক্ষর করেন।

এ বয়সে পড়াশোনা মুখস্থ হয় না বলে জানান, বেলায়েত। মুখস্থ না হওয়ায়, পড়ার পাশাপাশি তিনি প্রচুর লিখেন। বেলায়েত শেখ জানান, এমনও হয়েছে যে কোন লিখা ১০০ বারও লিখেছি। মায়ের দোয়াতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবেন বলে আশাবাদী তিনি। ইচ্ছে থাকলে উপায়, চেষ্টা, পরিশ্রম করলে এর ফসল ভাল হবে, বলে তিনি মনে করেন। কথার শেষ পর্যায়ে বেলায়েত বলেন, “শিক্ষা-দীক্ষার শিক্ষা চাই। শিক্ষার কোন বয়স নাই।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেলে পড়াশোনা ছেড়ে দিবেন কি’না জানতে চাইলে  বলেন, “কখনোই না! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) আমার স্বপ্ন বটে, তবে পড়াশোনা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই।” জীবদ্দশায় যতদূর পারা যায় তদ্দূর পর্যন্তই পড়বেন বলে জানান, জীবন যুদ্ধে জয়ী হতে চাওয়া ও স্বপ্নের পানে ছুটে চলা বেলায়েত শেখ।