রোববার   ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯   পৌষ ১ ১৪২৬   ১৭ রবিউস সানি ১৪৪১

বরিশাল প্রতিবেদন
ব্রেকিং:
স্বেচ্ছাসেবক ও শৃঙ্খলা উপ-কমিটির সভা আজ হঠাৎ পড়ে গেলেন মোদী সিটি ভোটে চূড়ান্ত প্রস্তুতি ইসির অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আওয়ামী লীগ এখন শক্তিশালী : ভূমিমন্ত্রী মেজাজ হারিয়ে দুই ঘণ্টায় ১২৩ টুইট করে ট্রাম্পের নতুন রেকর্ড! বিজয় দিবসে আসছে সাবিনা ইয়াসমিনের গান নারীর ক্ষমতায়নে বিস্ময়কর রেকর্ড হাত থেকে কোরআন পড়ে গেলে করণীয় সানিয়া মির্জার বোনের বিয়েতে বসেছিল চাঁদের হাট! বিএনপির ঘাড়ে ভর করেছে বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের প্রেতাত্মা ‘বোরকা পরে বাংলাদেশ থেকে এসেছি’ বিজেপি এমপির টুইটে ভারতে তোলপাড় বন্দে আলী মিয়ার জন্ম ‘২ ঘণ্টার মধ্যে উড়ে যাবে সালমান খানের গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্ট!’ গরুর খামারে কম্বল দান করলেই মিলবে বন্দুকের লাইসেন্স! আজ প্রকাশ হবে রাজাকারদের তালিকা সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ খুঁজছেন ব্রিটেনের রানি শামীমের ৩৬৫ কোটি টাকা, খালেদের ৩৪, সম্রাটের ‘তেমন নেই’ মাকাসিদুশ শরিয়া তত্ত্বের প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ লড়েছেন মোসাদ্দেক, জিতেছে ঢাকা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে সচেতন থাকতে হবে: প্রধানমন্ত্রী
৭৬

মৃতদের জন্য জীবিতদের করণীয় ও বর্জনীয়

প্রকাশিত: ২২ আগস্ট ২০১৯  

জন্মিলে মরিতে হবে―প্রকৃতির এক অমোঘ বিধান। মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে প্রত্যেককেই। কেউই রেহাই পাবে না মৃত্যু থেকে। মানুষ মরে যায়, রেখে তার কীর্তি। মৃত্যুর সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যায় আমলের ধারা। মৃত্যুই শেষ নয়, এক মহাজীবনের শুরু কেবল। তাই পরকালে শান্তিময় জীবন লাভ করতে চাইলে অবশ্যই দুনিয়াতে ভালো আমল করে যেতে হবে।

আমাদের সমাজে মানুষ পরলোকগত বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনের জন্য বিভিন্ন রকমের আমল করে থাকে। কিন্তু সঠিক পদ্ধতি না জানার কারণে ভুল করে থাকে অনেকেই। তাই আমাদের জেনে রাখা উচিত, কোন কোন আমল দিয়ে আমাদের মৃত পিতা-মাতা ও আত্মীয়ের উপকার হতে পারে। মৃত্যুর সময় থেকে মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে মৃত ব্যক্তির আত্মার রূহের মাগফিরাতের জন্য জীবিতরা কী কী করতে পারে এবং তাতে মৃত ব্যক্তির কতটুকু উপকার হয় তা আমাদের জানা উচিত।

সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, মানুষ মৃত্যুর পরও তার আমলনামায় দুই ধরনের আমল অব্যাহত থাকে। ১. মৃতের এমন আমল যা তার জন্য সদকায়ে জারিয়া হতে পারে। ২. এমন আমল যা মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতরা করে থাকে। যেমন মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতরা দুয়া-মাগফিরাত করা। তার মাগফিরাতের জন্য দান-সদকা করা। কিংবা তার জন্য নফল হজ ও উমরা করা ইত্যাদি।

সদকায়ে জারিয়া কী? 

মানুষ মৃত্যুর পরও জীবিত অবস্থায় কৃত আমলের মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে। হাদিসে এসেছে,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ : إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। নবি করিম (সা.) বলেন, ‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সব আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমলের দরজা বন্ধ হয় না। ১) সদকায়ে জারিয়া, ২) এমন জ্ঞান রেখে যায়, যা দিয়ে মানুষ উপকৃত হতে থাকে, ৩) এমন সন্তান রেখে যায়, যে সন্তান মা-বাবার জন্য দুয়া করবে। [মুসলিম, আসসাহিহ : ৩১৮৫] 

যেমন মসজিদ, মাদরাসা বা কোনো দীনি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে যাওয়া। অথবা জনকল্যাণমূলক কোনো কাজ করে যাওয়া, যার উপকার মানুষ তার মৃত্যুর পরও ভোগ করতে পারে অথবা এমন সন্তান রেখে যাওয়া, যারা মৃত্যুর পরও তাদের বাবা-মা, আত্মীয়ের জন্য দুয়া করতে থাকে। কিংবা সে নেক আমল করতে থাকে, যার সওয়াব মৃতব্যক্তি পেতে থাকবে। অথবা এমন ছাত্র তৈরি করে যাওয়া, যারা শিক্ষাবিস্তারে রত থাকে, এতে শিক্ষক তার সওয়াব পেতে থাকে। কিংবা এমন কোনো দীনি কিতাব রচনা করে যাওয়া, যা পড়ে মানুষ উপকৃত হতে থাকে।

দ্বিতীয়ত এমন আমল, যা মৃত ব্যক্তি নিজে করে যায়নি বা সে ওই আমলের জন্য কারণও ছিল না। কিন্তু তারপরও সে ওই আমলের সওয়াব পেতে থাকে। এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

মুসলমানদের দুয়া : কুরআন ও হাদিসের একাধিক জায়গায় মা-বাবার সাথে সব মুমিনের জন্যই দুয়া করার শিক্ষা দেয়া হয়েছে। কুরআনে এসেছে,

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا

‘হে আমাদের প্রভু! আমাদের ও আমাদের আগে যারা ইমান এনেছে, তাদের ক্ষমা করো। আর ইমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রেখো না।’ [সুরা হাশর, ৫৯ : ১০] 

رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ

‘হে আমাদের রব! রোজ কিয়ামতে আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সব মুমিনকে ক্ষমা করে দিন।’ [সুরা ইবরাহিম, ১৪ : ৪১] 

رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا

‘হে আমার রব! তাদের উভয়ের প্রতি রহম করো, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছে।’ [সুরা বনি ইসরাইল, ১৭ : ২৪] 

তাছাড়া রাসুল (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে মৃতদের জন্য দুয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, উসমান ইবনু আফ্ফান (রা.) বলেন, নবিজি (সা.) মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার কবরের পাশে দাঁড়াতেন এবং বলতেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করো এবং তার জন্য ইমানের ওপর অবিচল ও দৃঢ় থাকার দুয়া কামনা করো, কেননা এখনই তাকে প্রশ্ন করা হবে।’

মৃত ব্যক্তির জন্য যে জানাজার নামায পড়া হয়, সেটি তার জন্য দুয়া করার উদ্দেশ্যেই পড়া হয়। তাছাড়া রাসুল সা: একাধিক হাদিসে কবর যিয়ারত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এসব কিছু প্রমাণ করে, মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতদের পাঠানো দুয়া ও ইস্তিগফার তার কাছে পৌঁছে এবং এর মাধ্যমে তিনি উপকৃত হন। অন্যথায় তার জন্য জানাযার নামায পড়া তার কবর যিয়ারত করার কোনো অর্থ থাকে না।

মৃত ব্যক্তির জন্য দান-সদকা : হাদিসে আছে, ‘আম্মাজান আয়েশা (রা.) বলেন, জনৈক সাহাবি নবিজির কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার মা হঠাৎ মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি কোনো ওসিয়ত করে যেতে পারেননি। আমর ধারণা, তিনি যদি কথা বলার সুযোগ পেতেন, তাহলে দান-সদকা করতেন। আমি তার পক্ষ থেকে দান সদকা করলে কি তিনি এর সওয়াব পাবেন? নবিজি (সা.) বলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই পাবেন।’ [বুখারি ও মুসলিম] এই হাদিস থেকেও প্রতীয়মান হয় যে, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কেউ যদি দান সদকা করে তাহলে তিনি তার সওয়াব পাবেন এবং এর মাধ্যমে তিনি উপকৃত হবেন।

মৃত ব্যক্তির পক্ষে হজ আদায় : মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ আদায় করা যেতে পারে। যদি মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ অথবা উমরা আদায় করে তাহলে তার সওয়াব অবশ্যই মৃত ব্যক্তির কাছে যাবে। এর মাধ্যমে সে উপকৃত হবে। হাদিসে আছে : ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবিজির কাছে এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার বোন হজের মান্নত করেছিলেন, কিন্তু তিনি হজ সম্পাদন করার আগেই মৃত্যুবরণ করেন। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ আদায় করতে পারি?’ তিনি বললেন, ‘তোমার বোনের ওপর যদি ঋণ থাকত তবে কি তুমি আদায় করতে না?’ সে বলল, ‘অবশ্যই আদায় করতাম।’ নবিজি বললেন, ‘তাহলে তুমি তোমার বোনের পক্ষ থেকে হজ আদায় করো। কেননা আল্লাহর দাবি আদায় করার অধিক উপযোগী।’ [বুখারি ৮/১৪২] এত্থেকেও বোঝা যায়, হজ এমন একটি ইবাদত যা একে অন্যের পক্ষ থেকে আদায় করতে পারে এবং এর সওয়াব তার কাছে পৌঁছে।

মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি করা : মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি করা জায়েয এবং এ জন্য মৃত ব্যক্তি সওয়াব পাবে। হাদিসে আছে, রাসুল (সা.) একটি দুম্বা কুরবানি করেন, জবাই করার সময় বললেন, ‘এটি আমার উম্মতের ওই সব লোকের পক্ষ থেকে, যারা কুরবানি করতে পারেনি।’ সুতরাং কেউ যদি নিজের কুরবানির সওয়াবে তার বাবা-মা, আত্মীয় ও মৃত ব্যক্তির নিয়ত করে নেয়, তাহলে তার সওয়াব তারা পেয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ।

মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোজা রাখা : মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোজা রাখলে তার সওয়াব সে পাবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করল এ অবস্থায় যে, তার ওপর রোজা ফরজ ছিল তবে তার পক্ষ থেকে তার ওয়ারিশগণ রোজা রাখবে।’ [বুখারি ও মুসলিম]

ওপরের আমলগুলো ছাড়া মৃত ব্যক্তির নামে চল্লিশা করা, মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা, মিলাদ পাঠ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও বিদয়াত। বর্তমানে আমাদের দেশে অনেক স্থানে মৃত ব্যক্তির জন্য ভাড়া করা আলেম ও হাফেয দিয়ে কুরআন পড়ানো হয়। অনেক স্থানে আলেম বা হাফেযদের সাথে টাকা নিয়ে দরদাম হয়। এ ধরনের কর্ম সম্পূর্ণ হারাম ও বিদয়াত। মৃত ব্যক্তির জন্য কোনো আলেম, মাওলানাকে ভাড়া করে এনে কুরআন খতম করানো একটি নিষিদ্ধ ও পরিত্যাজ্য কাজ। পূর্ববর্তী মহামতি কোনো আলেম এ ধরনের কাজের অনুমতি দেননি। পরে কোনো কোনো পেটপূজারী আলেম নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এ রকম অনুমতি দিয়েছেন। এ ধরনের কাজ সাধারণত লোকলজ্জার ভয়ে করা হয়ে থাকে। আবার অনেকে ছোট ছোট ওয়ারিশ থাকা সত্ত্বেও তাদের মাল তাদের অনুমতি ছাড়া এসব কাজে খরচ করে, যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সুন্নাহসম্মত উপায়ে সমস্ত আমল পরিপালনের তাওফিক দিন। 

এই বিভাগের আরো খবর