বৃহস্পতিবার   ১৭ অক্টোবর ২০১৯   কার্তিক ১ ১৪২৬   ১৭ সফর ১৪৪১

বরিশাল প্রতিবেদন
ব্রেকিং:
বাংলাদেশে কাজ করার অনেক জায়গা আছে: ফিফা সভাপতি সৌদিতে বাসে আগুন ধরে ৩৫ ওমরাহযাত্রী নিহত রাজধানীতে `ফইন্নী গ্রুপের` ৬ সদস্য আটক স্পিকারের সঙ্গে সার্বিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ ক্লাসিকোর ভেন্যু পাল্টানোর অনুরোধ লা লিগার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১৮ কাউন্সিলর নজরদারিতে যেমন ছিল নবিজির জীবনের শেষ মুহূর্তটি দলের নাম ভাঙিয়ে অন্যায় করতে দেবেন না মেয়র সাদিক কমছে রাতের তাপমাত্রা, প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তা কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা এসআই আকরামসহ ১১ জন জেলহাজতে মানবতাবাদী নাট্যকার আর্থার মিলারের জন্ম মুখের কথায় চলে সাইদের ‘আশ্চর্য মোটরসাইকেল’ বরিশালে জাল-ইলিশসহ ২২জেলে আটক নীলনদের তীরে মিললো ‘গুরুত্বপূর্ণ’ প্রাচীন কফিন পর্দা নামলো ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড এক্সপোর কুষ্টিয়ায় শুরু হলো তিনদিন ব্যাপী লালনমেলা বাংলাদেশই বিশ্বসেরা, প্রবৃদ্ধি হবে ৭.৮ শতাংশ হাজার কোটি টাকার চেকের কপি প্রতারক চক্রের বাসায়! ৯ কর্মীকে তলব, একজনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ
১৮

জীব জন্তুর হাড় পুড়িয়ে শক্তি বৃদ্ধির ওষুধ তৈরি করেন এই বিজ্ঞানী

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

এই পৃথিবীর সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং তার নতুন নতুন আবিষ্কার প্রতিনিয়তই পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত প্রতিটি বস্তু নিয়ে বিজ্ঞানীগণ তার আবিষ্কারের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। কেউ আধুনিক বিজ্ঞানের ভীত গড়ে দিয়ে গিয়েছেন। কেউ তদের সারা জীবনের পরিশ্রমের ফসল নিঃস্বার্থে দান করে গিয়েছেন। আজ এমন বিশ্বখ্যাত তিনজন বঙ্গালী বিজ্ঞানীর গল্প বলব যারা তাদের আবিষ্কারের মাধ্যমে গোটা বিশ্বের ইতিহাস বদলে দিয়ে গিয়েছেন।

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় 

বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল রায় ছিলেন একজন অধ্যাপক ও বৈজ্ঞানিক। বিজ্ঞান নিয়ে তার পাগলামি প্রতিবেশীদের কাছে অসহ্য হয়ে ওঠেছিলো। তিনি ভাগাড় থেকে নানা রকম জীবজন্তুর হাড় গোড় তার বাড়ির ছাদে জড়ো করতেন এবং তার পচা দুর্গন্ধ চারদিকে ছড়াতে লাগলো। কাক ছাদ থেকে হাড় তুলে নিয়ে আশেপাশে তা ছড়াতে শুরু করে। পাড়ার প্রতিবেশিরা তা সহ্য করতে না পেরে যুবক প্রফুল্লকে বললেন, হাড়গোড়গুলো যদি এখান থেকে না সরান তাহলে পুলিশকে খবর দেয়া হবে এবং পৌরসভার লোকজনদের ডেকে এগুলো পরিষ্কার করানো হবে। যুবকটি পড়ল মহা ফ্যাসাদে, ঠিক তখনি যুবকটির একটি বন্ধু এসে তাকে বাঁচালেন। 

বন্ধু বললেন, লোকালয় থেকে বহু দূরে একটি খালি জমি আছে, সেখানে এই হাড়গোড়গুলো রাখাতে পারো। পরে যুবকটি যখন দেখলেন হাড়গোড়গুলো ভালভাবে শুকিয়ে গিয়েছে, ঠিক তখনি একদিন সন্ধ্যায় সেগুলো পোড়াতে গেলেন। আবার ফ্যাসাদ বাধলো। আগুন দেখে পুলিশ ছুটে এলো।

 

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় 

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় 

তিনি তাদের বোঝালেন যে, তিনি কোনো খুন করে লাশ পোড়াচ্ছেন না। তিনি যে হাড়গুলো এখানে পোড়াচ্ছেন সেগুলো হলো জীবজন্তুর হাড়। যুবকটি পরের দিন সেই হাড় পোড়া ছাই গবেষণাগারে নিয়ে গিয়ে ঘন সালেফিউরিক এসিডের সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন। এভাবেই তৈরি হলো সুপার ফসফেট অব লাইন। 

এই দ্রবণটি একটি বড় গামলায় মধ্যে ঢেলে ফুটাতে লাগলেন। কিছু সময়ের মধ্যে দলা দলা ফসফেস অব সোডার স্ফটিক দেখা গেল। যুবকটি একটি দলা মুখে দিয়ে চিবিয়ে খুশি হলেন। এভাবেই তিনি ফেলে দেয়া হাড়গোড় দিয়ে বল বর্ধন ওষুধ তৈরি করেন। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ভারতের প্রথম ওষুধ তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। কারখানাটির নাম ছিল বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মেসি। কারখানা থেকে লাখ লাখ টাকা লাভ হলে কি হবে তিনি সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন করতেন। ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে মার্ক ফিউরাস নাইট্রাইট আবিষ্কার তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য অবদান।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু

সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন ভারতীয় বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী, যার গবেষণার ক্ষেত্র ছিল গাণিতিক পদার্থবিদ্যা। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় কলকাতার সাধারণ একটি বিদ্যালয়ে। তার ছাত্রজীবন নিয়ে অনেক বিস্ময়কর উপকথা প্রচলিত আছে। স্কুলে একবার গণিত পরীক্ষায় তিনি ১০০-তে ১১০ পেয়েছিলেন। এই অসম্ভব ব্যাপারটি কীভাবে ঘটল, সেটা পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা গেল, তিনি প্রতিটি সমাধান সঠিক তো করেছেনই, আবার একটার সমাধান করেছেন দুইভাবে। তা দেখে শিক্ষক খুশি হয়ে ১০ নম্বর বেশি দিয়েছিলেন। 

তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, একদিন ক্লাসে পড়াচ্ছিলেন ফটো-ইলেক্ট্রিক ইফেক্ট এন্ড আল্ট্রাভায়োলেট হ্যাযার্ডস নিয়ে। তো পড়ানোর সময় তিনি শিক্ষার্থীদের বর্তমান তত্ত্বের দূর্বলতা বোঝাতে এই তত্ত্বের সঙ্গে পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের ব্যত্যয় তুলে ধরেন। সে সময় তিনি ওই তত্ত্ব প্রয়োগ করতে গিয়ে একটি ভুল করে বসেন। কিন্তু মজার ব্যাপারটা এখানেই ঘটে। তিনি দেখলেন, তার উক্ত ভুলের সঙ্গে পরীক্ষালব্দ ফল খুব সুন্দর মিলে যাচ্ছে। আর এই ভুল থেকেই বিজ্ঞানের এক নতুন সম্ভাবনার শুরু। 

 

সত্যেন্দ্রনাথ বসু

সত্যেন্দ্রনাথ বসু

ভিত্তি রচিত হয় কোয়ান্টাম পরিসংখ্যানের। আজ তিনি কোয়ান্টাম পরিসংখ্যানের জনক বলেও পরিচিত। তিনি ব্যাপারটা আন্তর্জাতিক মহলে জানাবেন বলে ভাবলেন। তার ওইদিনের লেকচারটি ছোট নিবন্ধ আকারে ‘Planck’s Law and the Hypothesis of Light Quanta’ নামে চার পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ আকারে পাঠালেন বিজ্ঞান সাময়িকী ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে। সেটি ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত হত। তবে দুঃখজনকভাবে সেখানে লেখাটি প্রকাশের যোগ্য বলে বিবেচিত হলো না। এরপর তিনি যা করলেন তা সাহসের কাজ বটে! তিনি দুম করে চিঠি লিখে বসলেন আইনস্টাইনের কাছে। আইনস্টাইন তার চিঠি পড়ে এতটাই অবাক হলেন এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে  আমন্ত্রণ জানালেন। এই নিয়ে সামনা সামনি কথা বলতে আগ্রহী তিনি।

পরে আইনস্টাইন নিজে সেই প্রবন্ধটি জার্মান ভাষায় লিখে প্রকাশ করেন  “zeits Fur physik” জার্নালে। প্রবন্ধটি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যাওয়ার ফলে সত্যেন্দ্রনাথ বসু সারা বিশ্বে খ্যাতি অর্জন করেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর তত্ত্বের কার্যকারিতা বুঝতে পেরে আইনস্টাইন অবিলম্বে একে আদর্শ গ্যাসের ক্ষেএে ব্যবহার করে এক নতুন থিওরি তৈরি করে যা আইনস্টাইন–বোসন কন্ডেন্সেশন থিওরি নামে পরিচিত। আর এই আইনস্টাইন–বোসন কন্ডেন্সেশন থিওরি নিয়ে কাজ করে অনেকে নোবেল পুরুষ্কার পাচ্ছেন আজকাল। যেমন দেখা যায় ১৯৮৪, ১৯৯৬, ১৯৯৯ এ পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কারগুলো যে তত্ত্বের ওপর দেয়া হয়। তার জন্যে পরোক্ষভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল আইনস্টাইন–বোসন কন্ডেন্সেশন থিওরি। বাঙালী এই মানুষটি ১৯৭৪ সালে পরলোকগমন করেন। অনেকের কাছে তার জীবনের গল্প অজানা।
 
উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী

বিশ্বের দ্বিতীয় ব্লাড ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠাতাকে আমরা একেবারেই অন্যভাবে চিনি, তার নাম উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী। যিনি কালাজ্বরের প্রতিষেধক আবিষ্কার করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। কলকাতায় তার হাত ধরেই জরুরি চিকিৎসা সেবায় অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছিল। শুধু তাই নয়, তৎকালীন ভারতীয় রেড ক্রস সোসাইটির প্রশাসনিক দফতরের প্রশাসক হিসেবে তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয়। ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুল; আজকের নীল রতন সরকার মেডিকেল কলেজ, সেখানকার একটি ছোট্ট কক্ষে নিজের গবেষণা শুরু করেছিলেন উপেন্দ্রনাথ।   

এক সময় আর্সেনিক, পারদ, কুইনাইন আর সোডিয়াম অ্যান্টিমনি টারটারেটের একটি মিশ্রণকে কালাজ্বরের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করা হত। কিন্তু তা কোনোভাবেই কালাজ্বর রোধে সম্পূর্ণ কার্যকরী ছিল না। উপেন্দ্রনাথ গবেষণাগারে সোডিয়াম এন্টিমনি থেকে সোডিয়ামকে পৃথক করে ইউরিয়া আর এন্টিমনির সংযোগে ইউরিয়া স্টিবামাইন এর যৌগ তৈরি করতে সক্ষম হলেন। তখন রাত দশটা। গবেষণাগার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুলের সেই ছোট্ট ঘরটির মধ্যে বিজ্ঞানী উপেন্দ্রনাথ সেদিন যা আবিষ্কার করলেন তিনি জানতেন না যে তার সেই আবিষ্কার একদিন লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচাবে।

গবেষণার ফলাফল দেখতে তিনি প্রথমে যৌগটিকে খরগোশের শরীরে প্রয়োগ করলেন। তিনি অবাক হয়ে পর্যবেক্ষণ করে বুঝলেন, তার গবেষণালব্ধ ইউরিয়া স্টিবামাইন যৌগটি কালাজ্বরের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ কার্যকর। সাড়া পড়ে গেল চারিদিকে। উপেন্দ্রনাথের আবিষ্কারের কথা প্রথম প্রকাশিত হয় ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অব মেডিক্যাল রিসার্চে’।

 

উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী

উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী

যেখানে আটজন কালাজ্বর রোগীকে সুস্থ করার বিবরণ প্রকাশিত হয়। উপেন্দ্রনাথ তার গবেষণাপত্রে ওষুধটি কতটা বিষাক্ত সে সম্পর্কেও আলোচনা করেন। পরে ‘ইন্ডিয়ান মেডিকেল গেজেটে’ ইউরিয়া স্টিবামাইন সম্পর্কে উপেন্দ্রনাথের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করে। এরপর উপেন্দ্রনাথ আরো কিছু তথ্য প্রকাশ করেন ‘ইন্ডিয়ান মেডিকেল গেজেটে’।  

কালাজ্বর ছাড়াও উপেন্দ্রনাথ ফাইলেরিয়া, ডায়াবেটিস, কুষ্ঠ, মেনিনজাইটিস প্রভৃতি রোগ নিয়েও গবেষণা করেছিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং-এর পেনিসিলিন আবিষ্কারের অনেক আগেই এই বাংলার উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী এন্টিমাইক্রোব্যাক্টেরিয়াল ড্রাগ হিসেবে ইউরিয়া স্টিবামাইনের আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে ছিল এক মাইলফলক। প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং পরে কলকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন উপেন্দ্রনাথ। সেখান থেকে মেডিসিন ও সার্জারিতে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। পড়াশোনায় বরাবরের মেধাবী ছাত্র উপেন্দ্রনাথ ‘গুডিভ’ ও ‘ম্যাকলাউড’ পদক লাভ করেন। 

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি এম.ডি ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। উপেন্দ্রনাথের গবেষণার মূল বিষয় ছিল ‘লোহিত কণিকার ভাঙন’। দীর্ঘদিন গবেষণার কাজে নিযুক্ত থাকার পর, উপেন্দ্রনাথ সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। তিনি গবেষণা কার্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার কথা অনেকদিন ধরেই ভাবছিলেন। সেই ভাবানা থেকেই কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটে নিজ বাসভবনে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ব্রহ্মচারী রিসার্চ ইনস্টিটিউট’। বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার প্রদীপ হয়ে জ্বলেছেন আলোচিত এই তিন মহাবিজ্ঞানী। এখনো লক্ষ লক্ষ অনুসন্ধিৎসু মানুষের দিশা হয়ে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের কাছে আমরা গভীরভাবে ঋণী।